২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে (৬-৩ ভোটে) প্রেসিডেন্টের আগের বিতর্কিত ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালত জানান, প্রেসিডেন্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের দোহাই দিয়ে এভাবে ঢালাও শুল্ক বসাতে পারেন না; কারণ কর আরোপের ক্ষমতা একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের। তবে রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘ধারা ১২২’ ব্যবহার করে নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রোক্লেমেশনে স্বাক্ষর করেন।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন এই শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট (ইএসটি) থেকে কার্যকর হবে। এটি প্রাথমিকভাবে ১৫০ দিন স্থায়ী হবে। তবে মার্কিন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে জ্বালানি তেল, জরুরি ওষুধ, কিছু কৃষিপণ্য এবং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামকে এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) এই শুল্ক সংগ্রহ করবে।
বাংলাদেশের ওপর এর আগে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ৩৫ শতাংশ, যা আলোচনার পর ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আগের হার বাতিল হওয়ায় এবং নতুন শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারিত হওয়ায় রপ্তানিকারকদের খরচ প্রায় অর্ধেক কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের জন্যও একই হার প্রযোজ্য হওয়ায় ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
পোশাক খাতের জন্য এই ১০ শতাংশ শুল্কও বড় ঝুঁকি। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মার্কিন বাজারে পণ্যের খুচরা মূল্য বেড়ে গেলে চাহিদা কমতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ৪৬ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও আয় ঝুঁকির মুখে পড়বে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক বছরে সংগৃহীত অতিরিক্ত শুল্ক ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য অর্থ ফেরত পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির বার্তা এনেছে। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার ফলে ভারতের প্রকৃত শুল্কের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে ভারতীয় টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত বড় ধরনের স্বস্তি পাবে। তবে ভারত যদি তার জ্বালানি তেলের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে পুনরায় উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি আয় প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেতে পারে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর জিডিপি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মুদ্রার অস্থিরতা ও বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন আপাতত স্থগিত রেখে ওয়াশিংটনের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে বিশেষ ছাড় আদায়ের চেষ্টা করা উচিত। একই সাথে এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। আগামী জুনে মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ববাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি। সূত্র: বিবিসি।
আই.এ/সকালবেলা